শেষ বিকেলের রোদ || বাংলা নতুন ভালোবাসার গল্প ২০২১ || Bengali New Love Story 2021 ||

                         গল্পের নাম :শেষ বিকেলের রোদ

"আপনি ঠিক আছেন তো? আমি ইচ্ছে করে...."

গাড়ি নিয়ে নিজের কোম্পানির বিশেষ কাজের জন্য পাশের শহরে যাচ্ছিলাম। জ্যামে আটকা পড়ে মেজাজটা অনেকটাই খারাপ ছিল। যখন জ্যাম ছাঁড়লো তখন সময় ও মেজাজ দুটোই খারাপ অবস্থা দেখে গাড়িটা জোরে টান দিতে যাবো ঠিক তখনি গাড়ির সামনে একটি মেয়ে এসে পড়ে। ভাগ্যিস তখনো আমি স্পিড তুলিনি। তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম মেয়েটা দুই হাত দুরে রাস্তায় আধা শোয়া হয়ে কোনো রকমে কোঁকাচ্ছে। আমি দৌড়ে ওনার কাছে যায়।
উনি নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। ওনার কাছে যেয়ে বসে যখন বললাম 'আপনি ঠিক আছেন তো..আপনাকে আমি ইচ্ছে করে...' পুরো কথাটা শেষ করতে পারিনি। মেয়েটা আমার দিকে তাকাল। আমি হতভম্বের মত কয়েক সেকেন্ড রাস্তার উপরে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আশে পাশে ততক্ষনে অনেক লোগ জড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি পাবলিকদের দিকে তাকিয়ে মেয়েটার হাত ধরে বললাম..
- প্লীজ কান্না করবেন না। আমি হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। আসুন আমার সাথে।
মেয়েটার আর কোনো কথা না শুনে এক প্রকার জোর করেই গাড়িতে তুললাম। পায়ের পাতা আর কনুইতে একটু কেঁটে গিয়েছে। আমি গাড়ি চালিয়ে হসপিটালে আসলাম। সারা রাস্তা মেয়েটা কান্না করে গেছে।
.
বেশ কিছু সময় পর মেয়েটা স্বাভাবিক হয়। ডক্টর মেডিসিন দিয়ে গেছে। আমি মেয়েটার কেবিনে যেয়ে ওনার সামনে এসে দাঁড়ালাম। ওনার দিকে তাকিয়ে বললাম..
- সরি ম্যাম, আসলে বুঝতেই পারিনি এভাবে এমন কিছু হবে।
- কেমন আছেন আবির সাহেব? চেনার পরেও না চেনার অভিনয়টা দারুন করছেন।
আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। মাথাটা নিচু করে কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। এখন কি বলবো ঠিক মাথায় আসছে না। হুমম। বেডে আধা শোয়া হয়ে থাকা মেয়েটাকে আমি চিনি। সাত বছর আগে সে ছিল আমার স্টুডেন্ট। নাম প্রনয়া। সে বলে ওঠে.
- কেমন আছেন?
- সরি প্রনয়া, আমি ইচ্ছে করে আপনার সামনে আসতে চাইনি। এভাবে হুট করে এতকিছু হয়ে যাবে আমি একদমই বুঝতে পারিনি। প্লিজ আমাকে মাফ করে দিন। আমি কখনো আপনার সামনে আসবো না।
প্রনয়া চুপ হয়ে বসে রইল। আমি মাথাটা উঁচু করে ওর মুখের দিকে তাকালাম। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ও। আমি একটু মুচকি হেসে ঘুরে চলে আসতে যাবো সে ডাক দিল। আমি দাঁড়ালাম।
- আবির সাহেব, প্লীজ যাবেন না। আমাকে মাফ করে দিন।
- আরে আমি ওসব কিছু কোনোদিন মনেই করিনি। আপনিই মাফ করে দিন, আপনার কথাটা রাখতে পারিনি। আপনার সামনে ভুল করে চলে এসেছি। সরি।
- আবির....
আমি আর দাঁড়ালাম না। কি দরকার শুধু শুধু কথা বাড়ানোর। সাত বছর আগের ঘটনাগুলো এমনিতেই ভুলতে বসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে ওকে এভাবে দেখবো কখনো কল্পনাও করিনি।
.
সাত বছর আগে আমি ওকে পড়াতাম। সে ছিল আমার ছাত্রী। স্টুডেন্ট পড়িয়ে কোনোরকমে মাস চলে যেতো আমার। গ্রামে বাবা ছিল গরীব কৃষক। সেখান থেকে মাস শেষে টাকা পাবো সেই আশা করাটা বোকামো ছাড়া কিছুই ছিল না। বাবার থেকে কখনো টাকা চাইনি আমি। চাইবো কিভাবে? ওনার দেওয়ার মত পরিস্থিতি তো ছিল না।
যখন প্রবল ইচ্ছেটাকে পুঁজি করে ঢাকার উদ্দেশ্যে পাঁড়ি জমিয়েছিলাম তখন বাবা অভিযোগ বর্ষিত গলায় বলেছিল "আবির, পড়তে যাচ্ছিস ঠিক আছে। অনেক খরচ। আমি কিন্তু একটা টাকাও তোকে দিতে পারবো না। তোর পড়ার খরচ তুই নিজেই চালাবি। কখনো টাকার কথা বলতে পারবি না।" বাবার দিকে তাকিয়ে সেদিন কিছু বলিনি। কেবল পা ছুঁয়ে সালাম করে চলে আসি ঢাকায়।
আগেই কিছু জমানো টাকা ছিল। ভার্সিটিতে চান্স পাবো একটা বড় রকমের ইচ্ছেছিল আমার। তাই অগ্রীম জমিয়ে রেখেছিলাম। পাড়ার একটা ভাই থাকতো ভার্সিটির মেঁচে। সেই সুবাদে আমিও উঠি সেখানে। কোনো রকমে আধা পেটা খেয়ে তিনমাস মত চলে আমার। এরপর যখন আর চলছে না তখন শহরের এক বড় ভাইয়ের সুবাদে প্রনয়াকে পড়ানোর টিউশনির সুযোগ আসে।
.
প্রনয়া ছিল ধনী পরিবারের একমাত্র মেয়ে। ওর কলেজ ছিল আমার ভার্সিটির পাশেই। সকাল টাইমে যখন ওকে পড়াতাম মাঝে মধ্যে ওরই রিকশাতে করে ভার্সিটিতে আসতাম। কয়েকমাস পড়ানোর পর একদিন রিকশা করে ওর কলেজের সামনে আসতেই কতগুলো বান্ধবি প্রনয়ার কাছে এসে দাঁড়ায়।
প্রনয়া রিকশা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আমার দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে "মিস্টার আবির। নামুন রিকশা থেকে? আপনার কি কোনো লজ্জা শরম বলতে কিছুই নেই? একটুও কি লজ্জা করে না আপনার রোজ রোজ আপনাকে আমি রিকশা ভাঁড়া দিই? কেনো করবে লজ্জা? আপনাদের মত নিম্ন মানের ছেলেরা তো এরাকমই সুযোগ খোঁজে।
আপনার মত ছ্যাঁচড়া টাইপ লোক আমি কোনোদিন দেখিনি। শুনুন, আপনাকে আমি দরকার হলে রোজ রিকশা ভাড়া বাসা থেকে দেবো কিন্তু আমার পাশে বসে কখনো রিকশাতে করে আসবেন না। আপনি জানেন..? আপনি আমাকে পড়ানোর যোগ্যতা বা আমার টিচার হওয়ার যোগ্যতা রাখলেও আমার পাশে বসার কোনো যোগ্যতা আপনার নেই। আপনার মত.. না সরি, শুনুন আপনার থেকে উচ্চ লেভেলের ছেলে না আমার পিছনে কুকুরের মত ঘোরে। আর আপনি তো পড়ানোর সুবাদে আমার সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন এটাই তো আপনার অনেক বড় ভাগ্য। কিন্তু শুনুন আবার বলছি, আমাকে কেবল পড়ানোর যোগ্যতা রাখেন। কিন্তু আমার পাশে বসার কোনো যোগ্যতা আপনার নেই আর না কোনোদিন হবে। হাজারটা ছেলে আমার সাথে শুধু কথা বলার জন্য পিছনে পড়ে আছে। তাদের পার্সোনালিটি আর স্মার্টনেস দেখে আমার পাশে বসতে আইসেন। ফালতু ছেলে কোথাকার।"
.
প্রনয়ার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। হুম কথাটা সত্য যে প্রতিদিনকার রিকশা ভাড়া বাঁচানোর জন্য প্রনয়ার সাথে আমি একি রিকশাতে আসি। কিন্তু ও ঠিক এভাবে বলবে কোনোদিন কল্পনা করিনি। আমাকে তো ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতো। সবার সামনে এতবড় অপমান করে বলার কি ছিল? খুব জোরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে আমার। অপমানে মুখটা যেন আমার লাল হয়ে গেছে।
অনেক ছেলে মেয়ে আশে পাশে জড়ো হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে দেখছে। আমি সাথে সাথেই মাথা নিচু করে নিই। গরীবেরা হয়ত বড়লোকদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না কিন্তু গরীবদের একটা নিজস্ব আত্বসম্মান থাকে। যা কখনো শেষ হতে দেয়না তারা। বড়লোকেরা চাইলে সব পারে কিন্তু গরীবেরা তা পারে না।
.
মাথাটা নিচু করে তাড়াতাড়ি চলে আসি সেখান থেকে। তবে আসার সময় একটা ছেলের সাথে ধাক্কা লাগে আমার। আর সাথে সাথেই সেই ছেলেটা আমার গালে কষে চড় বসিয়ে দিয়ে বলে "শোন, হারামির বাচ্চা। প্রনয়ার মত মেয়ের পাশে এ কয়েকদিন বসেছিস এটা তোর সৌভাগ্য। কিন্তু এরপর যদি ওর পাশে পড়ানোর ছাড়া দেখি তোর খবর আছে।" কথা শুনে বুঝেছিলাম ও আমাকে ইচ্ছে করেই ধাক্কা দিয়েছে। আর তারপর আমার গায়ে হাত তোলে। অথচ ছেলেটা আমার থেকে পাঁচ বছরের ছোট বলেই মনে হল।
কয়েক সেকেন্ড ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হনহন করে চলে আসি আমি। এরপর প্রনয়াকে পড়ানোর দিন আসে দুইদিন পর। যাবো কি যাবো না ভেবে গিয়েছিলাম। কারন সেদিন ছিল মাস শেষ। আর বেতনটা খুব প্রয়োজন ছিল। চড়া বেতনের টিউশনিটা ছিল। বেতনটা মিস করার জন্য গিয়েছিলাম। কি করবো, গরীবেরা হয়ত একটু লজ্জাহীন হয়। এত অপমানের পরও যেতে হচ্ছে। তারমানে এই নয় যে গরীবেরা লজ্জা পায়না। আসলে গরীবেরা জানে দুইবেলা ভাতের সাধে তরকারিরীতে লবন বা তেলের পরিমান কম হয়েছে তবুও দিব্যি তৃপ্তি করে কিভাবে খেতে হয়।
.
প্রনয়াকে পড়াতে যেয়ে ওর দিকে তাকায়নি। যদিও আমি চেয়ারে বসতেই সে সে এসে বলতে থাকে..
- এই নিন আপনার টাকা। আর আবার বলছি, আজকে যেন দয়া করে আমার রিকশাতে যাবেন না। চাইলে গাড়ি নিয়ে যেতে পারি আমি। কিন্তু আমার সেটা পছন্দ না। ভুলেো যেন তাড়াতাড়ি আমার রিকশাতে যাবেন না।
কথাটা শেষ করতেই আমি প্রনয়ার দিকে তাকালাম। টেবিলে থাকা একটি খামে টাকাটা তুলে নিয়ে পকেটে গুজলাম। কোনো প্রকার কথা মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না আমার। প্রনয়া আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলে..
- আপনার পকেটে কি ওটা দেখি।
সাদা শার্ট পরেছিলাম। বুক পকেটের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা সাদা কাগজ রাখা। কিন্তু এটা কোথা থেকো আসলো? আর এটাই প্রনয়ার চোখে পড়লো। এখন নাও করতে পারছি না। আমি পকেট থেকে বের করে প্রনয়ার দিকে বাড়ি দিয়ে বসে আছি। ও ভাঁজ খুলে কয়েক সেকেন্ড পর বলে.. "আমার দিকে তাকান।" আমি মাথা তুলে ওর দিকে তাকাতেই আমার গালে কষে একটা চড় পড়ে। আমি সাথে সাথেই বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলি..
- এই মেয়ে কি সমস্যা তোমার? আমাকে কি তোমার জোকার মনে হয়? যখন যা ইচ্ছে সেটাই করবে? সবার সামনে অপমান করেছো। এখন বাড়িতে আমাকে চড় মারলে। কি মনে হয় তোমার? গরীব বলে কি প্রতিবাদ করাটা আমাদের রাইটের মধ্যে পড়ে***
- চুপ? তোর লেকচার থামা। লজ্জা করে না তোর এভাবে আমার সামনে জোরে গলায় কথা বলতে? আমাকে নিয়ে লাভ লেটার লিখে আমাকেই কথা শোনাচ্ছিস? নিজেকে একবার আয়নাতে দেখেছিস তুই? তোর যোগ্যতার বিচার করেছিস কখনো? হারামজাদা।
আমি সাথে সাথেই প্রনয়ার থেকে কাগজটা কেঁড়ে নিয়ে দেখি সেখানে লেখা "প্রনয়া, আমি তোমাকে ভালোবাসি খুব।" আমি লেখাটা পড়ে অবাক হয়ে যায়। মানে কি এইটার? এটা আমার শার্টের মধ্যে কখন আসলো? মেসের কেউ তো রাখবে না। তাহলে কে রেখেছে? তখনি মনে পড়ে সেদিন প্রনয়া অপমান করার পর যে ছেলের সাথে ধাক্কা খেয়েছিলাম সেই ছেলে হাতাহাতির সময় আমার বুকে হাত দিয়েছিল। কিন্তু অপমানে এতটাই জর্জরিত ছিলাম কিছুই মাথায় আসেনি।
আর মজার ব্যাপার হল, আমি শার্টটা আর কাঁচিনি। সেদিন পরেছিলাম আর দুইদিন পর আজকে পরেছি। কারন শার্টটা একটু নতুন নতুন লাগে আমার কাছে। তাই প্রনয়াকে পড়াতে আসি এটা পরে মাঝে মধ্যে। কিন্তু এটাই যে আজকে আমার কাছে সবচাইতে হাস্যকর আর যোগ্যহীন বানিয়ে দেবে কে জানতো? প্রনয়ার চিৎকারে ওর মা দৌড়ে আসে। কাগজটা দেখে আমাকে তিনিও অপমান করতে ছাড়েনি। আসলে প্রনয়ার মায়ের কোনো দোষ নেই। দোষটা পরিস্থিতির। ঘরোটা টিচার তুলেও তিনি অপমান করতে ছাঁড়েন নি।
আমার টিউশনিটা চলে যায়। বাড়ি থেকে বের করে দেয় আমাকে। চলে আসার আগে প্রনয়া অপমান করে বলেছিল "আমার সামনে তোকে যেন আর না দেখি। যেদিন যোগ্যতা অর্জন করবি সেদিন আসিস। হয়ত তোর দিকে তাকাবো।"
.
সেদিন মাথাটা নিচু করে চলে আসি। এরপর মেচে এসে রুমে বসে বসে পড়াশোনার প্রতি মন দিলাম। সাথে ভাইয়াকে বলে একটা ছেলে স্টুডেন্ট কে খুজে দিতে বলি। কিন্তু সেটা এত সহজে হয়নি। কারন আমার মত হাজারটা ছেলে পড়ার খরচ চালানোর জন্য টিউশনি খুজে বেড়ায়।
তিনমাস পর টিউশনিটা আসে। ওনাদের ফ্যামিলিতে একটাই ছেলে ছিল। ছেলেটার মা ছিল না। বাবার কাছে থাকতো। ছেলেটার সাথে বন্ধুত্ব হয় আমার। ভাগ্যের পরিহাসে এটাই আংকেলের ভালো লাগে। ওনার সাথেও মিশে যায় আমি। কথায় আছে না "উপর ওয়ালা যা দেয়, তা খুশি করেই দেয়।" ঠিক তাই হয়। ওনার ছোট ব্যবসাতে আমাকে দেখাশোনার ছোট্ট একটি কাজ দেয়। মাসে কিছু টাকা বেতন পেতাম। আস্তে আস্তে আমার আর ওনার চেষ্টায় ব্যবসাটা বিশাল হয়।
ভাগ্য ক্রমে কয়েক বছর পর আমিই হয়ে যায় সেই ব্যবসার অর্ধেকের বেশি মালিক। আর নিজের একটা কোম্পানিও তৈরী করে ফেলি। তাই সেই কাজের জন্য আজকে যখন বেরিয়েছিলাম গাড়ি নিয়ে ঠিক তখনি জ্যামে পড়ে সেই প্রনয়ার সাথে দেখা।
.
গাড়ি চালিয়ে বাড়িতে আসি। এখন সব আছে। টাকা,গাড়ি বাড়ি সবকিছু। শুধু ভুলতে পারিনা সাত আট বছরে ঘটা অপমানগুলো। তবে ভালোই হয়েছে। প্রনয়ার অপমানের পর আমি এখন সব মানুষকে ভালোবাসতে শুরু করেছি। সেদিন হয়ত ঐ ছেলেটা আমাকে তাড়ানোর জন্যই আমার বুক পকেটে কাগজটা গুজে দিয়েছিল।
.
মাস খানিক পর অফিসে বসে কাজ করছি তখনি দারোয়ান এসে দাঁড়ায় আমার সামনে। সালাম দিয়ে বলে..
- স্যার, আপনার সাথে একজন মেয়ে দেখা করতে চায়। ভিতরে পাঠিয়ে দেবো?
- মেয়ে?
- জ্বি স্যার।
- আচ্ছা পাঠিয়ে দিন।
দারোয়ান চলে যায়। আমি কাজে মন দিলাম। কয়েক মিনিট পর শুনতে পেলাম "কেমন আছেন আবির সাহেব?" আমি চোখ তুলে তাকায় সামনে। চমকে উঠি আমি। প্রনয়া আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ও কিভাবে জানলো আমি এখানে? ওকে দেখে বললাম..
- আরে তুমি? গরীবের এখানে কি মনে করে? ছোট একটা চাকরি করি, তুমি আমার সাথে দেখা করতে আসবে, ভাবতেই পারিনি।
- হিহিহি... আগের কথা সব মনে আছে? আর আমি জানি এআ কোম্পানিটা দেশের পাঁচটা বৃহৎ কোম্পানির একটি। আর তার মালিক আবির। এটা কোনো ছোট চাকরি না।
- ও। তা কিছু বলবা?
- আমার সাথে আজকে বিকেলে দেখা করবেন?
- উমম.. কোথায়?
- লেকে কিংবা টিএসসিতে।
- ওখানে তো সব কাপলেরা যায়। (আমি)
- হিহিহি, আমরাও যাবো। চারটার সময় চলে আসবেন। আমি থাকবো।
.
প্রনয়া চলে গেলো। আমি অবাক হলাম না। তবে ভাবলাম এত বছর পর এখন হুট করে এভাবে দেখা করার কথা কেনো বলছে ও? কেমন একটা উত্তেজনা কাজ করছে আমার মাঝে। যদিও এটার কোনো সঠিক এন্চার পাচ্ছি না।
.
বিকেল চারটা বাজে। আমি টিএসসির সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখি প্রনয়া দাঁড়িয়ে আছে। আমি হেঁটে এগিয়ে গেলাম ওর দিকে। আমাকে দেখে মুচকি হেসে ভিতরে আসার ইশারা করলো। আমি গেলাম ওর সাথে।
কিছু সময় হাঁটার পর আমাকে একটা বসার জায়গা দেখিয়ে বলল বসতে। আমি বসলাম। ও আমার পাশে এসে বসতেই আমি উঠে গেলাম।
প্রনয়া আমার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিভাব এনে বলল..
- কি ব্যাপার উঠছেন কেনো?
- না মানে, সরি। তোমার অনুমতি না নিয়ে তোমার পাশে বসেছি। সরি।
- প্লীজ, এভাবে বলবেন না। বসুন।
আমি বসলাম। তবে কিছুটা দুরত্ব রেখেই বসলাম আমি। দুজনেই চুপ হয়ে রইলাম কিছু সময়। নীরাবতা ভেঙে প্রনয়া বলল..
- সরি আবির সাহেব।
- কেনো? (আমি)
- সেদিনের জন্য সরি। আসলে আমি বুঝতে পারিনি অপমানটা অনেক বেশি হয়ে যাবে।
- আমি কিছু মনে করিনি।
আবারো দুজন চুপ হয়ে গেলাম। আমি কি বলবো সেটা বড় বিষয় না। প্রনয়া আমাকে কি বলবে সেটা ও ভেবেই চলেছে। আমি মুচকি হেসে আঁড়চোখে তাকালাম। প্রনয়া বললো..
- সরি। সেদিন আমার কথামত আপনার পকেটে কাগজটা রাখে আমার বন্ধুটা। কারন বাসা থেকে আপনাকে তাড়াতে চেয়েছিলাম।
- আরে আমি এসব ভুলেই গিয়েছি। আমি ওসব নিয়ে ভাবনাটা সাত বছর আগেই ফেলে এসেছি। তো তোমার কথা বলো। কেমন আছো? কি করছো এখন? বিয়ে করেছো?
- পড়াশোনা চলছেই। আর বিয়ে করিনি। আপনি বিয়ে করেছেন? (প্রনয়া)
- নাহ।
- আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসি। (প্রনয়া)
- গুড।
- কিন্তু ছেলেটা আমাকে ভালোবাসে না।
- সো স্যাড। তাকে জানিয়েছো?
- নাহ। জানাবো ভাবছি।
- হুম জানিয়ে দাও।
আবারো চুপ হয়ে গেলাম দুজনেই। পাঁচটা বেজে গিয়েছে। আর থাকবো না। ওর থেকে দুরে থাকতে হবে। কেমন যেন একটা চাপা রাগ জমতে শুরু করেছে আমার। আমি বসা থেকে ওঠার প্রস্তৃতি নেবো সেসময় ও বলে..
- আমি আপনাকে ভালোবাসি। শুনতে হয়ত হাস্যকর বা মজা মনে হচ্ছে। কিন্তু এটাই সত্যি। আপনাকে অপমানের বেশ কয়েক মাস পর উপলব্ধি করি আপনার কথা আমার সবসময় মনে পড়ছিল। মিথ্যে হলেও চিরকুটে লেখাটা আমার মনে পড়তো বারবার। কিভাবে যে হঠাৎ করে আপনার শুন্যতা অনুভব করা শুরু করেছিলাম বুঝতে পারিনি। আপনাকে কত খুজেছি। দুটো কারনে খুজেছি। সরি বলার জন্য,আর ভালোবাসি তা প্রকাশ করার জন্য। ভালোবাসি আপনাকে।
প্রনয়ার কথা শুনে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। বিকেলের রোদটা আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে আসতে লাগল। আমি ওর সামনে যেয়ে দাঁড়ালাম। কিছুটা সময় ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম..
- হুমম, আমিও তোমাকে ভালোবাসি। সেই প্রথম থেকে তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। চলো বিয়ে করি। হিহিহি.. কি মনে হয় প্রনয়া, আমি তোমাকে এটাই বলবো? না কখনো না। আমি মজা করলাম। চাইলে এখন তোমাকে ভালোবাসার জন্য চড় মারতে পারি। কিন্তু সেটা আমি করবো না। কারন গরীবেরা চাইলেও অনেক কিছু পারে না।
তোমাকে চাইলে এখনি সবার সামনে অপমান করে কথা শোনাতে পারি। কিন্তু সেটাও আমি করবো না। কারন গরীবেরা যোগ্যতার বিচার করে না। করে আত্বসম্মানের। আর শোনো, কারো পাশে বসা আর ভালোবাসি বললেই যে যোগ্যতার বিচার করো এটা বোকামি।
কাউকে ভালোবাসতেই পারে মানুষ। আর সেটা প্রকাশ করতেই পারে। তার মানে এই নয় যে ভালোবাসার অপরাধে অপমান, যোগ্যতা, চড় ইত্যাদি প্রয়োগ করে কথা শোনাতে হবে। ভালো থেকো প্রনয়া। চাইলে তোমাকে গ্রহন করতে পারতাম এখন। কিন্তু নিজের সাথে আর নিজের আত্বসম্মানকে বড্ড বেশি অপমান করা হবে। ভালো থেকো।
.
কথাগুলো বলে আর দাঁড়ালাম না। পিছনে একবারো তাকালাম না আমি। শেষ বিকেলের রোদটা যেন একদম নেতিয়ে পড়েছে। অলসভাবে মৃদু কিরণ দিতে লাগলো সূর্যটা। কি হাস্যকর। সূর্যকে তখনি সবাই মূল্য দেয় যখন রাত না হওয়ার আগে কিরণ দেয়। রাত আসার পর তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। শেষ বিকেলের রোদ আমার প্রচন্ড ভালো লাগে। আর এখন পুরোনো স্মৃতিগুলো এই বিকেলের রোদের মতই ফুরিয়ে ফেলে দিয়ে আসলাম। হারিয়ে ফেললাম সূর্য ডোবার মত করে।

Post a Comment

Previous Post Next Post